The Byun Shi-Ji AtlasWORKS · FŪDO · LANGUAGES

Byun Shi-Ji/যে চিত্রকর বাতাস গিলে ফেলেছিলেন/চিত্রকর

Byun Shi-Ji · 邊時志

যে চিত্রকর বাতাস গিলে ফেলেছিলেন

চিত্রকর

2 / 3 · বাংলা


লেখা: Byun Joung Hoon

I

শেষ পর্যন্ত আমি ফিরে এসেছি

শেষ পর্যন্ত আমি ফিরে এসেছি।
ছয় বছর বয়সে এই দ্বীপ ছেড়েছিলাম। ওসাকা, টোকিও, তারপর আবার সিউল। এর মধ্যে চল্লিশ বছর কেটে গেছে।
লোকে বলত আমি জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছি। জাপানে বড় পুরস্কার পেয়েছি, সিউলের শিল্পজগতে নাম করেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের পড়িয়েছি। ভেবেছিলাম এসবই আমার পথ।
কিন্তু একদিন হঠাৎ নিজের ছবি দেখতে দেখতে বুঝলাম। এই ছবির কোথাও আমি নেই। শিক্ষকের ছাপ আছে, সময়ের চলতি রীতি আছে, পাশ্চাত্যের কৌশল আছে।
শুধু আমি নেই।
সেই রাতে অনেকক্ষণ ঘুম আসেনি। জানালার বাইরে সিউলের আলো বয়ে যাচ্ছিল। আলোর ওপারে কোথাও যেন হাওয়ার শব্দ শুনছিলাম। অনেক আগে মায়ের পিঠে চেপে চলে যাওয়ার দিনের সেই হাওয়া।

জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলাম। লোকে বাধা দিল। “ওই নির্জন দ্বীপে গিয়ে কী করবেন?” উত্তর দিতে পারিনি। শুধু জানতাম, আমি যাচ্ছি না, কিছু একটা আমাকে ডাকছে।

বিমান থেকে নেমে প্রথম আবার সেই হাওয়ার মুখোমুখি হয়ে বুঝলাম। হাওয়া কোমল ছিল না। যেন আমাকে চেনে না, রুক্ষভাবে ধাক্কা দিল, পোশাকের ভেতর নোনা বাতাস ঢুকিয়ে দিল, আমি ঘুরে দাঁড়ালে পেছন থেকে কাঁধে দুবার আঘাত করল। সেই রুক্ষ স্পর্শ অদ্ভুতভাবে অচেনা লাগল না। শৈশবে মায়ের পিঠে যে হাওয়া গায়ে লাগত, ঠিক সেই হাওয়া।

মা সেই হাওয়াকে ‘হালমাং’ বলতেন। বলতেন, চান্দ্র বছরের দ্বিতীয় মাসের প্রথম দিনে পশ্চিমের সমুদ্র থেকে এসে পনেরো দিন থেকে চলে যায়। চালের পিঠা বানিয়ে সমুদ্রতীরে নিবেদন করতে ভুলো না, বলতেন। ছোট এক থালা পিঠা, নোনা সমুদ্রবাতাস, আর মায়ের হাতের গন্ধ।

টোকিওর রাস্তায় হাঁটতে গিয়েও, সিউলের আঁকার ঘরে তুলি ধরেও, হালমাং নামটি একবারও মনে পড়েনি। চল্লিশ বছরে একবারও নয়। শিখেছিলাম তা কুসংস্কার, ভেবেছিলাম নির্বোধ পুরোনো প্রথা।

কিন্তু বিমান থেকে নামার সেই মুহূর্তে নামটি আগে আমার শরীরে ফিরে এল। আমার মাথা যা মনে রাখেনি, কাঁধ তা মনে রেখেছিল। মুখে লাগা হাওয়া মায়ের কণ্ঠে আমাকে ডাকল।
আমি কখনোই চলে যাইনি।

শুধু অনেক দিন, অনেক অনেক দিন ধরে ফিরে আসার পথে ছিলাম।

↑ চিত্রকর

II

আমার হাত খালি ছিল

আমার হাত খালি ছিল।
ফিরে আসার প্রথম বছর কিছুই আঁকতে পারিনি। আঁকার ঘর গুছিয়েছিলাম, ক্যানভাস দাঁড় করিয়েছিলাম, রং গুলেছিলাম। তুলি ধরেছিলাম, কিন্তু হাত নড়েনি। কী আঁকব বুঝতে পারছিলাম না।
টোকিওতে শেখা কৌশল এই মাটিতে বেমানান ছিল। সিউলে যে দৃশ্য আঁকতাম তা এখানে ছিল না। আমার যা কিছু ছিল, এই জায়গায় সবই অকেজো।
লজ্জা পেয়েছিলাম। চল্লিশ বছর ধরে আঁকা একজন মানুষ খালি ক্যানভাসের সামনে শিশুর মতো দাঁড়িয়ে ছিল।

আঁকার ঘরের দরজা বন্ধ করে মাঠে গেলাম। কিছু দেখতে চাইছিলাম না। শুধু সেখানে থাকতে চাইছিলাম। এই ভূমির মাটিতে, এই পরিবেশের হাওয়ায়।

সূর্য উঠল, অস্ত গেল। ঘাস দুলল, টাট্টু চলে গেল। আমি কিছুই করিনি। শুধু দেখেছি। এমন দিনও ছিল, নিচু এক খড়ের ঘরের সামনে তুলি অনেকক্ষণ থেমে ছিল। আকৃতির আগে ভঙ্গিটি চোখে পড়েছিল। তার সামনে ধীরে ধীরে শিখেছিলাম, ছবি আঁকতে তাড়াহুড়ো করা চলে না।

এভাবেই এক বছর গেল। লোকে হয়তো ভেবেছিল আমি আঁকা ছেড়েছি। কখনো আমিও তাই ভাবতাম।
কিন্তু এখন ফিরে তাকালে দেখি, সেই বছরই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হাতে ধরা সবকিছু নামিয়ে রাখতে এক বছর লেগেছিল। খালি হাত হতে এক বছর লেগেছিল।
হাত খালি হলেই যে স্থানীয় পরিবেশ আমার হাতে কিছু দিতে পারে, তখনও তা জানতাম না।

শুধু অপেক্ষা করেছিলাম।

↑ চিত্রকর

III

আমি ঘাসপাতার রং দেখেছিলাম

আমি ঘাসপাতার রং দেখেছিলাম।
সেবার শরতের শেষ। মাঠে বসে আনমনে হাত বাড়িয়ে একটি ঘাসপাতা ছিঁড়লাম। তালুর ওপর রেখে অনেকক্ষণ দেখলাম।
আমি ঘাসপাতার রং দেখেছিলাম।
অদ্ভুত ব্যাপার। চল্লিশ বছর ধরে এঁকেও কখনো এমন ঘাসপাতার রং দেখিনি। সবুজ বলে পাশ কাটিয়েছি, শুকনো পাতা বলে ভুলে গেছি।
কিন্তু সেদিন তালুর ওপরের পাতাটিকে কোনো নামেই ডাকতে পারছিলাম না। গ্রীষ্মের সবুজ পুরোটা বেঁচে পার হওয়া রং। শরতের রোদে ধীরে শুকিয়ে যাওয়া রং। অগণিত বার হাওয়ায় ঘষা খাওয়া, নুনে জারিত রং। সময়ের গড়া রং, স্থানীয় পরিবেশের নিংড়ে দেওয়া রং।
তা সোনালি নয়। সোনালি বড় বেশি জমকালো। বাদামিও নয়। বাদামি বড় বেশি অন্ধকার। তা শুকনো ঘাসের রং। অন্য নাম নেই। সে রং শুধু সেই রংই।

পাতাটি নিয়ে আঁকার ঘরে ফিরলাম। রং মেশাতে শুরু করলাম। কয়েক দশবার ব্যর্থ হলাম। মাটি মেশালে বড় ভারী হত, হলুদ মেশালে বড় হালকা। সবুজের স্মৃতি বাঁচাতে চাইলে মিথ্যা হয়ে যেত, শুধু শুষ্কতায় জোর দিলে মৃত রং হত।
কয়েক দিন পরে অবশেষে রংটি ক্যানভাসে ফুটে উঠলে হাত থামিয়ে অনেকক্ষণ দেখলাম। আমি তা তৈরি করিনি। স্থানীয় পরিবেশ আমার হাত ধার করে নিজের রং এঁকেছে।

সেদিন প্রথম জানলাম।
ছবি আমি আঁকি না।

↑ চিত্রকর

IV

আমি টাট্টুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলাম

আমি টাট্টুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলাম।
মাঠে প্রথম যেদিন প্রাণীটিকে দেখি, অনেকক্ষণ নড়তে পারিনি।

ছোট, রোগা ঘোড়া, এলোমেলো কেশর। স্থলভাগের ঘোড়ার মতো বড় নয়, গায়ে জেল্লাও নেই। দৌড়ের ঘোড়া নয়, গাড়ি টানার ঘোড়াও নয়। শুধু এই মাটির হাওয়া, বৃষ্টি, রোদ সহ্য করে বেঁচে থাকা এক বুড়ো প্রাণী।
সে আমাকে দেখল। আমিও তাকে দেখলাম। অদ্ভুত কিছু ঘটল।
তার বাঁকা পিঠে নিজের পিঠ দেখলাম।
নুইয়ে পড়া ঘাড়ে নিজের ঘাড় দেখলাম।
হাওয়ায় ঘষা খাওয়া কেশরে দেখলাম চল্লিশ বছর ঘুরে ফিরে আসা নিজের চুল।
লজ্জা লাগল, আবার ভালোও লাগল।
স্থলভাগে থাকতে বড় ঘোড়া আঁকতে চাইতাম। চকচকে পেশি, উড়ন্ত কেশর, রাজসিক ঘোড়া। পাশ্চাত্যের চিত্রকরদের আঁকা ঘোড়ার মতো। কিন্তু এই মাটিতে তেমন ঘোড়া নেই। এখানে আমার মতো ঘোড়া আছে। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, ছোট হয়ে গেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চলে যায়নি।
সেদিন আঁকার ঘরে ফিরে প্রথম টাট্টু আঁকলাম। বড় করে আঁকিনি। জমকালো করে আঁকিনি। যেমন আছে তেমনই বাঁকা পিঠ, নুইয়ে পড়া ঘাড় আর এলোমেলো কেশর আঁকলাম।
ছবি শেষ করে এক পা পিছিয়ে দেখতেই হেসে ফেললাম।

ওটা টাট্টুর প্রতিকৃতি নয়।
ওটা আমার আত্মপ্রতিকৃতি।

↑ চিত্রকর

V

আমি কাককে গ্রহণ করেছিলাম

আমি কাককে গ্রহণ করেছিলাম।
এক শীতের সকালে আঁকার ঘরের জানালার কাছে একটি কালো পাখি বসেছিল। রোগা, এক পা-ওয়ালা বুড়ো কাক, একটি চোখ ঘোলা। অন্য পাখিরা দল বেঁধে উড়ে গেলে একা পড়ে থাকা পাখি।
তাড়াইনি। শুধু মুখোমুখি তাকিয়েছিলাম।

স্থলভাগে বলত, কাক শুভ পাখি নয়। কাক ডাকলে অমঙ্গল লাগে বলে লোকে নুন ছিটিয়ে দিত। আমিও দীর্ঘদিন তা শিখেছি, বিশ্বাস করেছি।
কিন্তু সেদিন সকালে জানালার কাছে কাকটি ভয়ের কিছু ছিল না। সে শুধু চলে যেতে পারেনি। দল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, এক চোখে পৃথিবী দেখে। আর শেষ পর্যন্ত এই জায়গা ছেড়ে যায়নি।

চিনতে পেরেছিলাম। পাখিটির মধ্যে যা আছে, আমার মধ্যেও তা আছে। স্থলভাগের শিল্পজগৎ থেকে সরিয়ে দেওয়া মানুষ। এক চোখে, হয়তো ভুল চোখে, পৃথিবী দেখে আসা মানুষ। তবু শেষ পর্যন্ত নিজের জায়গা ছাড়েনি।

সেদিন থেকে কাক আঁকতে শুরু করলাম। লোকে অবাক হল। “কাকই কেন আঁকেন? ম্যাগপাই আছে, সাদা বকও আছে।”

উত্তর দিতে পারিনি। শুধু জানতাম। কাক শুভ পাখিও নয়, অশুভ পাখিও নয়। কাক হল স্থানীয় পরিবেশের সহিষ্ণুতার মধ্য দিয়ে টিকে থাকা মানুষদের অবয়ব। যারা এই জায়গা ছাড়েনি, এই জায়গা রক্ষা করেছে, শেষ পর্যন্ত নিজের রং হারায়নি, তাদের অবয়ব।
আমার ছবির কাক বিষণ্ণ নয়।
শুধু দীর্ঘকাল সহ্য করা মুখ তার।

জানি, আমার মুখ ক্রমে সেই মুখের মতো হয়ে উঠছে।

↑ চিত্রকর

VI

আমি ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়েছিলাম

আমি ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়েছিলাম।
সেবার শরতে তিন দিন তিন রাত হাওয়া থামেনি। ছাদ উড়ে গেছে, মাছ ধরার নৌকা ভেঙেছে, মানুষের উদ্বেগ হাওয়ায় মিশেছে।

আঁকার ঘরে বসে থাকতে পারিনি। জানি না কী আমাকে টেনেছিল। হাতে শুধু একটি লাঠি, খড়ের বর্ষাতিও গায়ে না দিয়ে খাড়া পাহাড়ের ধারে গিয়েছিলাম।

ঢেউ পাহাড়ের মতো উঠে ভেঙে পড়ছিল। হাওয়া আমাকে ঠেলছিল। আর এক পা এগোলেই কালো সমুদ্রে টেনে নিয়ে যেত। অদ্ভুতভাবে ভয় লাগেনি।

হাওয়া পোশাকের প্রান্ত ছিঁড়ে ভেতরে ঢুকে শরীরের মধ্যে এক পাক ঘুরে বেরিয়ে গেল। প্রথমবার বুঝলাম, স্থানীয় পরিবেশের মধ্যে থাকা কী।

স্থলভাগে বৃষ্টি এড়াতাম। হাওয়া ঠেকাতাম, ঝড়কে ভয় পেতাম। সেসব ছিল আমার বাইরে, আমাকে হুমকি দেওয়ার জিনিস।

কিন্তু সেদিন খাড়া পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে বুঝলাম। স্থানীয় পরিবেশ আমার বাইরে নয়। তা সেই স্থান, যার মধ্যেই শুধু আমার অস্তিত্ব সম্ভব।

ঝড় বিপর্যয় ছিল না। ঝড় ছিল স্থানীয় পরিবেশের নিজেকে গভীরতমভাবে প্রকাশ করার মুহূর্ত। সেই মুহূর্তেই আমি অবশেষে তার অংশ হলাম।

আঁকার ঘরে ফিরে সমুদ্র আঁকতে শুরু করলাম। আমার সমুদ্র শান্ত নয়। আমার সমুদ্র সবসময় তোলপাড় করে। কালো, রুক্ষ, জীবন্ত।

লোকে জিজ্ঞেস করে, “শান্ত সমুদ্র আঁকেন না কেন?” বলি, “আমি যে সমুদ্র দেখেছি, তা কখনো শান্ত ছিল না।”

সেদিন খাড়া পাহাড়ের ওপর সারাজীবন যে সমুদ্র আঁকব, তাকে দেখেছিলাম।

↑ চিত্রকর

VII

আমি রং ছেড়ে দিয়েছিলাম

আমি রং ছেড়ে দিয়েছিলাম।
টোকিও থেকে আনা রং ছিল। কোবাল্ট নীল, ক্যাডমিয়াম লাল, গভীর আল্ট্রামারিন, জমকালো সিঁদুর লাল। ইউরোপ থেকে আসা উৎকৃষ্ট রঞ্জক, প্রতিটি কৌটো মূল্যবান। বহুদিন যত্নে রেখেছি। যথেচ্ছ ব্যবহার করিনি, পরিষ্কার করে মুছে রেখে দিয়েছি।

কিন্তু এই দ্বীপে থাকতে থাকতে রংগুলি ক্রমে বেমানান লাগছিল। কোবাল্ট নীলে এখানকার সমুদ্র আঁকা যেত না। এই সমুদ্র আরও কালো, আরও রুক্ষ, আরও গভীর। ক্যাডমিয়াম লাল এখানে কোথাও ছিল না। এই দ্বীপে অত চিৎকার করা রং নেই। আল্ট্রামারিন, সিঁদুর লাল, কোনোটি এই পরিবেশের ভাষা নয়।

একদিন সব রং এক জায়গায় জড়ো করলাম। অনেকক্ষণ দেখলাম। সেগুলি আমার যৌবনের গৌরব, প্রতিষ্ঠার প্রমাণ, আত্মাভিমান। কিন্তু এই পরিবেশের রং নয়। ফেলে দিইনি। শুধু গভীর ড্রয়ারে রেখে আর বের করিনি।

সেই জায়গায় নতুন রং রাখলাম। মাটি, কালি, আর নিজের তৈরি শুকনো ঘাসের রং। জমকালো নয়। মাত্র তিনটি।

লোকে অবাক হল। “রং খুব কম নয় কি? আরও নানা রং ব্যবহার করা উচিত।”

উত্তর দিতে পারিনি। শুধু জানতাম। রং বেশি হলেই ছবি সমৃদ্ধ হয় না। রং কম হলেই তারা নিজের জায়গা পায়।

এখন আমার ক্যানভাসে মাত্র তিনটি রং। কিন্তু জানি, সেই তিন রঙের মধ্যে এই দ্বীপের সমস্ত সময় আছে। আর রঙের মাঝখানে ছেড়ে রাখা জায়গা, শূন্যস্থানটিই ছিল সবচেয়ে ভারী। খালি জায়গা শূন্য ছিল না। না-বলা কথা, না-আঁকা জিনিস আর রেখে দেওয়া সময় তার মধ্যে ছিল।
ছেড়ে দেওয়াই সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল। কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার পরেই অবশেষে আঁকা শুরু করলাম।

↑ চিত্রকর

VIII

আমি নিজের নাম খোদাই করেছিলাম

আমি নিজের নাম খোদাই করেছিলাম।
বিশেষ কোনো দিন নয়। শুধু একটি ছবি শেষ করে তুলি ধুচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি ক্যানভাসের এক কোণ খালি। স্বাক্ষর করার জায়গা। হাত একটু থেমে গেল।
অনেক দিন ধরে নিজের নাম লিখতে কষ্ট হত। টোকিওর দিনের নামে জাপানি উচ্চারণ মিশে ছিল, সিউলের দিনের নামে শিল্পজগতের ভার চাপানো ছিল। কোনো নামই এই জায়গায়, এই ছবির ওপর মানাত না।

তুলি তুলে আবার নামিয়ে রাখলাম। অনেকক্ষণ বসে ছিলাম। জানি না তখন কী আমাকে পথ দেখাল। ছোট তুলিতে কালি লাগিয়ে ক্যানভাসের এক কোণে একটি অক্ষর লিখলাম।
জি(志), অর্থ সংকল্প।
বড় করে লিখিনি। গর্ব করেও লিখিনি। শুধু একজন মানুষ একটি সংকল্প নিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার চিহ্ন হিসেবে লিখেছি। ছদ্মনাম নয়, আসল নামও নয়। শুধু নিজের দেওয়া নিজের নাম। টোকিওর দেওয়া নয়। সিউলের দেওয়া নয়। শিক্ষকের দেওয়া নয়, বংশের দেওয়াও নয়।

খালি হাতে স্থানীয় পরিবেশের সামনে হাঁটু গেড়ে শুকনো ঘাসের রং গ্রহণ করার সেই জায়গায় আমার ভেতর থেকে উঠে আসা একটি অক্ষর। অনেকক্ষণ অক্ষরটি দেখলাম। লজ্জা লাগল না। অবশেষে নিজের আঁকা ছবিতে নিজের নাম লিখতে পারলাম।

কিন্তু সময় গেলে দেখলাম, অক্ষরটি শুধু নাম নয়। সারাজীবন আঁকা সব ছবি শেষ পর্যন্ত একটি সংকল্পই বহন করেছিল, তাই অক্ষরটি স্বাক্ষরও, শিরোনামও। নিজের দেওয়া নামটি আমার সমস্ত ছবির শিরোনাম হয়ে উঠল।
চল্লিশ বছর লেগেছিল।

↑ চিত্রকর

IX

আমি কথা হারিয়েছিলাম

আমি কথা হারিয়েছিলাম।
নাম খোদাই করার সেই দিন থেকে কথা ক্রমে কমে এল। দেখতে আসা মানুষদেরও দীর্ঘ উত্তর দিতাম না। চিঠিতেও ছোট বাক্য লিখতাম। কখনো সারাদিন একটি কথাও বলিনি।
লোকে মাঝে মাঝে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করত, “শরীর খারাপ?” শুধু হাসতাম।

অসুস্থ ছিলাম না। শুধু বলার কথা কমে এসেছিল। অদ্ভুত ব্যাপার। স্থলভাগে থাকতে অনেক কথা বলতাম। চিত্রকলার তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতাম, সহকর্মীদের সঙ্গে সারারাত আলোচনা করতাম, পাশ্চাত্যের শিল্পধারা আর প্রাচ্যের চেতনা নিয়ে লিখতাম। ভেবেছিলাম সেই কথাগুলিই আমার চিন্তা।

কিন্তু এই পরিবেশে এসে বুঝলাম। অত কথা আমার চিন্তা নয়। শুধু নীরবতার ভয়ে বলা কথা। এখানে নীরবতা ভয়ের ছিল না। কথা থামাতেই অন্য শব্দ শুনতে পেলাম।

ঘাসপাতায় হাওয়ার ঘষা লাগার শব্দ।
টাট্টুর শ্বাস স্থির করার শব্দ।
কাকের ডানা গোটানোর শব্দ।
দূরে সমুদ্রের পাশ ফেরার শব্দ।
আর সব শব্দের নিচে স্থানীয় পরিবেশের নিজের নিচু কণ্ঠস্বর।

কথা না বলেই অবশেষে সেই কণ্ঠ শুনতে পেরেছিলাম।

একদিন এক অতিথি জিজ্ঞেস করল, “এখানে আপনার নিঃসঙ্গ লাগে না?”

উত্তর দিতে পারিনি। শুধু জানালাটি আর একটু খুলে দিয়েছিলাম। অতিথি হয়তো বুঝতে পারেনি, সেটাই আমার উত্তর।

কথা না থাকার জায়গায় স্থানীয় পরিবেশ ভরে ওঠে। পরিবেশে ভরে ওঠা জায়গায় ছবি বেড়ে ওঠে।

সেই সময় থেকে ছবির একটি কাঁপা রেখাও আর সংশোধন করতাম না। তরুণ বয়সে মুছে ফেলতাম যে কাঁপন, তা যেমন ছিল রেখে দিতাম। অনেক দিন পরে শিখেছিলাম, নিখুঁত হওয়ার চেয়ে জীবন্ত থাকা আগে।

এখন কথার বদলে ছবি দিয়ে উত্তর দিই।

↑ চিত্রকর

X

আমি স্থানীয় পরিবেশ হয়ে উঠেছি

আমি স্থানীয় পরিবেশ হয়ে উঠেছি।
আজ সকালে আঁকার ঘরের জানালা খুললাম। হাওয়া ঢুকে পোশাকের প্রান্ত দুলিয়ে দিল। ফিরে তাকাইনি। শুধু তুলি ধরলাম।

প্রথম এখানে এসে সবকিছুকে ভয় পেতাম। হাওয়া, ঝড়, নীরবতা। আর সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম নিজেকে। হাত খালি হওয়া, নাম হারানো, মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়া, সব ভয়ের ছিল।
কিন্তু এখন ভয় নেই। হাত খালি হয়েছিল বলেই স্থানীয় পরিবেশ তা ভরে দিয়েছে। সবকিছু নামিয়ে রেখেছিলাম বলেই ভেতর থেকে একটি নাম উঠেছে। মানুষ ভুলেছিল বলেই স্থানীয় পরিবেশ আমাকে মনে রেখেছে।

স্থলভাগে ছবি আঁকতাম।
এই পরিবেশে আমি ছবি হয়ে উঠেছি।

আমার বাঁকা পিঠ টাট্টুর পিঠের মতো, আমার একটি ঘোলা চোখ বুড়ো কাকের চোখের মতো, আমার শুকনো হাত শুকনো ঘাসের রঙের মতো। আমার নীরবতা স্থানীয় পরিবেশের নিচু কণ্ঠের মতো।

তরুণ বয়সে ভালো আঁকতে শিখেছি। বুড়ো হয়ে শিখেছি কী ছেড়ে দিতে হয়। আমার ছবি দেরিতে এসেছে, তাই অবশেষে আমার হয়েছে।

এখন জানি। জীবন নির্বাসন। কিন্তু শিল্প আশীর্বাদ। নির্বাসনের জায়গাতেই শুধু পাওয়া যায় সেই আশীর্বাদ।

স্থলভাগে আমার ছবি ছিল। এখানে স্থানীয় পরিবেশ আমার হয়েছে। আর সে আমাকে নিজের মধ্যে গ্রহণ করেছে।

একদিন তুলি নামিয়ে রাখার দিন আসবে। সেদিন হাওয়া আমার শেষ শ্বাস নিয়ে মাঠে, সমুদ্রে, শুকনো ঘাসে ফিরিয়ে দেবে। সেজন্য দুঃখ করি না। আমি তো এরই মধ্যে এই পরিবেশের অংশ হয়েছি।

↑ চিত্রকর

৩৪টি ভাষা